সন্তানের জন্য একজন বাবা কতটা নিঃস্বার্থ হতে পারেন—কিশোরগঞ্জের বাছির উদ্দিন মিলনের (৪২) জীবনাবসান যেন তারই এক হৃদয়বিদারক দৃষ্টান্ত। নিজের জীবনের ঝুঁকি উপেক্ষা করে গভীর পানিতে ডুবে যাওয়া মেয়েকে উদ্ধার করতে ঝাঁপ দিয়ে সফলভাবে তাকে বাঁচালেও শেষ পর্যন্ত নিজেই হাওরের পানিতে প্রাণ হারান তিনি।
মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটেছে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখলা হাওরের পাশে মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন এলাকায়। কয়েক মুহূর্ত আগেও যেখানে পরিবার নিয়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে সময় কাটাচ্ছিলেন মিলন, অল্প সময়ের ব্যবধানে সেই আনন্দ পরিণত হয় শোকের মাতমে।
নিহত মো. বাছির উদ্দিন মিলন কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার গাইটাল পেট্রল পাম্প এলাকার বাসিন্দা এবং মো. আবু বাক্কার মাস্টারের ছেলে। তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কর্মজীবনে অসংখ্য মানুষের শারীরিক কষ্ট লাঘবে কাজ করা এই মানুষটি শেষ মুহূর্তে নিজের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে রক্ষা করলেন প্রিয় কন্যাকে।
স্বজনরা জানান, কয়েকদিনের অবসরকে স্মরণীয় করে রাখতে শুক্রবার বিকেলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে হাওরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে যান মিলন। নৌকায় ঘোরাঘুরির একপর্যায়ে করিমগঞ্জ উপজেলার শেষ সীমানা ও মিঠামইন উপজেলার হাসানপুর ব্রিজসংলগ্ন একটি ডুবুডুবু সড়কের পাশে নৌকা ভিড়িয়ে পরিবারের সদস্যরা পানিতে গোসল করতে নামেন।
এ সময় অসাবধানতাবশত মিলনের মেজো মেয়ে শেমন্ত্রী আক্তার গভীর পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করলে এক মুহূর্ত দেরি না করে পানিতে ঝাঁপ দেন তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, প্রাণপণ চেষ্টায় মেয়েকে নিরাপদে তীরে তুলতে সক্ষম হলেও প্রবল স্রোত ও গভীর পানির সঙ্গে লড়াই করে আর নিজে ফিরতে পারেননি। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি পানির নিচে তলিয়ে যান।
পরিবারের সদস্যদের চিৎকারে স্থানীয় নৌকার মাঝি ও এলাকাবাসী দ্রুত উদ্ধারকাজে অংশ নেন। দীর্ঘ চেষ্টার পর তাকে পানির নিচ থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও ততক্ষণে তিনি মারা যান।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সোহেব খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে বাছির উদ্দিন মিলন পানিতে তলিয়ে যান। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
শুক্রবার রাত ১০টার দিকে কিশোরগঞ্জ সার্কিট হাউসের সামনে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বন্ধু ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
সহকর্মীদের ভাষ্য, মিলন ছিলেন অত্যন্ত শান্ত, দায়িত্বশীল ও মানবিক একজন মানুষ। রোগীদের প্রতি তার আন্তরিকতা ছিল প্রশংসনীয়। পরিবারই ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেই পরিবারের একজন সদস্যকে বাঁচাতেই তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করে রেখে গেলেন এক অনন্য পিতৃত্বের দৃষ্টান্ত।

