সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে বরাদ্দের সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয়ের প্রচলিত প্রবণতার বিপরীতে ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলার দুই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। খাল পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করে সব ব্যয় মিটিয়েও উদ্বৃত্ত ১ কোটি ৮০ হাজার ৫৩৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের নজির স্থাপন করেছেন ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান এবং সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ শাওন।
উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারের দেশব্যাপী খাল পুনঃখনন কর্মসূচির আওতায় ফরিদপুর-৪ (ভাঙ্গা-সদরপুর-চরভদ্রাসন) আসনের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলায় চারটি খাল পুনঃখননের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়। প্রায় তিন মাসব্যাপী এ প্রকল্পে মোট ২২ দশমিক ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে।
চারটি প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৫ কোটি ৭৮ লাখ ৬০ হাজার ২৬৯ টাকা। এর মধ্যে ভাঙ্গা উপজেলায় বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৬৫ টাকা। সব কাজ সম্পন্ন করার পর উদ্বৃত্ত ৬৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯১৬ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়। অপরদিকে সদরপুর উপজেলায় ২ কোটি ১৮ লাখ ৩ হাজার ৮০৪ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে কাজ শেষে ৩৬ লাখ ৪০ হাজার ৬২০ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
ভাঙ্গা উপজেলায় ঘারুয়া ইউনিয়নের শরিফাবাদ হালন ফকিরের বাড়ি সংলগ্ন এলাকা থেকে খারদিয়া হয়ে শাহজাহান শেখের বাড়ি এবং সেখান থেকে কুমার নদ পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এছাড়া মানিকদাহ ইউনিয়নের বলেরবাগ থেকে সোনাখোলা পর্যন্ত আরও ৮ কিলোমিটার খাল খনন করা হয়। ফলে উপজেলাটিতে মোট ১৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
সদরপুর উপজেলায় লোহারটেক ব্রিজ থেকে শ্রীরামদী বাজার পর্যন্ত ৪ কিলোমিটার এবং দড়িকৃষ্ণপুর কাটাখাল ব্রিজ থেকে ভুবনেশ্বর নদীমুখী প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। এতে মোট সাড়ে ৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন সম্পন্ন হয়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, খালগুলো পুনঃখননের ফলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে, জলাবদ্ধতা কমবে, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে কঠোর তদারকি, সঠিক পরিমাপ, প্রকৃত শ্রমিকের মাধ্যমে কাজ বাস্তবায়ন এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের ফলে বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগের বিপরীতে এ প্রকল্প স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক বাস্তবায়নের উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য শহিদুল ইসলাম বাবুল নিয়মিত প্রকল্পের অগ্রগতি তদারকি করেন। জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলামও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে কাজের গুণগত মানের প্রশংসা করেন। এছাড়া গত ১৬ মার্চ দেশব্যাপী নদী-নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে ভাঙ্গা উপজেলার প্রকল্পের উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সদস্য ও জনপ্রতিনিধিরা জানান, ইউএনওদের নিয়মিত তদারকি, স্বচ্ছতা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কারণেই প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছে।
ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহামুদুল হাসান বলেন, উন্নয়ন কাজের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সততা নিশ্চিত করাই ছিল তাদের প্রধান লক্ষ্য। সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং উদ্বৃত্ত অর্থ বিধি অনুযায়ী সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও জানান, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অপচেষ্টা ঠেকাতে শুরু থেকেই কঠোর নজরদারি রাখা হয়েছিল।
সদরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফ শাওন বলেন, এটি সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প। কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ না দিয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক টাকাও ব্যয় করা হয়নি। সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করেই উদ্বৃত্ত অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে যেমন কাজের মান উন্নত হয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রের অর্থও সাশ্রয় হয়। ফরিদপুরের ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলার এই উদ্যোগ দেশের অন্যান্য সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্যও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

