ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত রাজনৈতিক জোটে ভাঙনের ইঙ্গিত মিলছে। সম্প্রতি খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর এবার জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রগুলো বলছে, এনসিপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বর্তমান জোটে থাকার রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতি নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে কওমি ঘরানার ইসলামপন্থী দলগুলোর সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক সমঝোতা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে বিকল্প জোট গঠনের সম্ভাবনাও বিবেচনায় রয়েছে।
দলটির নেতারা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদে একটি বৃহৎ জাতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়াই এনসিপির লক্ষ্য। তাদের মতে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে থাকলে নেতৃত্বের পরিসর সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠলে সেখানে নেতৃত্বের ভূমিকায় থাকার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট একীভূত করার লক্ষ্যে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’র আওতায় জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ কয়েকটি দল জোট গঠন করে। পরে এনসিপি, এবি পার্টি ও এলডিপি যুক্ত হলে জোটটি ১১-দলীয় রূপ নেয়। তবে আসন সমঝোতা নিয়ে মতবিরোধের কারণে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নির্বাচন শুরুর আগেই জোট ত্যাগ করে। নির্বাচনের পর নেতৃত্ব, রাজনৈতিক কৌশল ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নিয়ে শরিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
গত ২৫ জুলাই খেলাফত মজলিস জোট ছাড়ার ঘোষণা দিলে জোটের সংকট আরও দৃশ্যমান হয়। এরপর এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ে বর্তমান জোটে থাকা নাকি নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণে যুক্ত হওয়া—এ দুই বিষয় গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি, কওমি ঘরানার কয়েকটি ইসলামপন্থী দলের সঙ্গে এনসিপির শীর্ষ নেতাদের একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে। এসব বৈঠকে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচার প্রক্রিয়া, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নতুন কোনো রাজনৈতিক জোট গঠিত হলে সেখানে এনসিপির ভূমিকা নিয়েও মতবিনিময় হয়েছে বলে জানা গেছে।
এনসিপির রাজনৈতিক পর্ষদের এক সদস্য জানিয়েছেন, জুলাই মাসের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সাংগঠনিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে এনসিপি। ইতোমধ্যে পাঁচটি সিটি করপোরেশনে সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে দলটি। পাশাপাশি উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যায়েও প্রার্থী বাছাই কার্যক্রম চলছে।
ঘোষিত তালিকায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে দলের মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের নাম রয়েছে। এছাড়া কুমিল্লা, রাজশাহী ও সিলেটেও সম্ভাব্য প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তবে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হলে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের প্রার্থী তালিকায় পরিবর্তন আসতে পারে বলেও দলীয় সূত্রে আলোচনা রয়েছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা জোটগত অবস্থানের পক্ষেই রয়েছেন।
অন্যদিকে ইসলামপন্থী রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গত ১৬ জুলাই চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় সাতটি ইসলামি দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ঐক্য, স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে অংশ নেওয়া সূত্রগুলোর দাবি, সংশ্লিষ্ট দলগুলোকে আগামী ৩ আগস্টের মধ্যে লিখিত মতামত ও প্রস্তাব জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর সম্ভাব্য নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের কাঠামো, নেতৃত্ব ও কর্মসূচি চূড়ান্ত হতে পারে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব হাফেজ মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ বলেন, এনসিপির নেতাদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তবে তারা নতুন উদ্যোগে যুক্ত হবে কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কিছু বলা যাচ্ছে না।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জোটের ভেতরে কোনো সমস্যা থাকলে তা আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান করা হবে। এনসিপির রাজনৈতিক তৎপরতা তাদের নিজস্ব বিষয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জাতীয় পর্যায়ের সমঝোতা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না; প্রয়োজন হলে স্থানীয় পর্যায়েই সমঝোতা হতে পারে।

