প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য সব ধরনের সেবা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, সহজলভ্য, নিরাপদ ও অধিকারভিত্তিক করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজধানীতে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা বলেন, আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তবায়নের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, সামাজিক কুসংস্কার এবং জবাবদিহিতার অভাবে প্রতিবন্ধী নারীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও নিরাপদ চলাচলে নানা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাজধানীর দি ডেইলি স্টার ভবনের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে ‘প্রতিবন্ধী নারীদের অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা প্রাপ্তি’ শীর্ষক এ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। বিদেশি দাতা সংস্থা FJS ও DRF-এর অর্থায়নে এবং উইমেন উইথ ডিজঅ্যাবিলিটিজ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (WDDF)-এর আয়োজনে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ। সভাপতিত্ব করেন WDDF-এর চেয়ারপারসন শিরীন আক্তার। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক আশরাফুন নাহার মিষ্টি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন WDDF-এর প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট কোঅর্ডিনেটর শারমিন আক্তার দোলন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ আবু ইউসুফ বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কোনো কমিটি বা আলোচনা হলে সেখানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তিনি জানান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গণপূর্তসহ আটটি অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে ৩৮ লাখ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে সরকার। প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আরও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করতে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
WDDF-এর চেয়ারপারসন শিরীন আক্তার বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দাবিগুলো যথাযথভাবে তুলে ধরার জন্য একটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির মাধ্যমে তাদের দীর্ঘদিনের দাবিগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এবিএফের চেয়ারপারসন মহুয়া পাল বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিরাপদ ও সহজ চলাচলের জন্য দেশে এখনও পর্যাপ্ত পরিবহনব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তিনি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল ও পরিবহনব্যবস্থা আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করার দাবি জানান।
সাইটসেভার্স বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃতা রেজিনা রোজারিও বলেন, প্রতিবন্ধী নারী ও কিশোরীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও আর্থসামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি বঞ্চিত। তাদের দাতব্য সহায়তার পরিবর্তে অধিকারভিত্তিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে হবে।
স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হাবিব সরকারি ভবন, পার্ক, খেলার মাঠ, রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামোর নকশায় সার্বজনীন ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। দেশে বিদ্যমান ভবন ও নগর অবকাঠামো প্রতিবন্ধীবান্ধব কি না, তা অডিট করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সাবিনা নাসরিন বলেন, নারীদের সুরক্ষায় আইন থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তার যথাযথ বাস্তবায়ন হচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ জবাবদিহিতার ঘাটতি। সরকারি বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ করা অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
ইউএন উইমেন বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট সাপোর্ট অফিসার নাজমা আরা বেগম পপি বলেন, দেশে নারীদের সুরক্ষায় আইন থাকলেও প্রতিবন্ধী নারীরা এখনও যৌন সহিংসতাসহ বিভিন্ন ঝুঁকির শিকার হচ্ছেন। প্রতিবন্ধী অধিকার সুরক্ষা আইন-২০১৩-এর কিছু জায়গা আরও স্পষ্ট ও কার্যকর করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মূল প্রবন্ধে শারমিন আক্তার দোলন বলেন, প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক সেবা বা বিশেষ সুবিধা কোনো করুণা নয়, এটি তাদের অধিকার। আইন, নীতি ও বাজেটের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় প্রতিবন্ধী নারীদের নিজেদের কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সেমিনারে আইনজীবী, স্থপতি, উন্নয়নকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, প্রতিবন্ধী নারী, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের প্রতিনিধি এবং গণমাধ্যমকর্মীসহ প্রায় ৭০ জন অংশ নেন। আলোচনায় প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বিদ্যমান সেবা ব্যবস্থায় প্রবেশগম্যতা ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি অধিকার, মর্যাদা ও সমান সুযোগ প্রতিষ্ঠায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, পেশাজীবী ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

