বাংলাদেশের অর্থনীতির সঞ্চালন পথ বা ‘লাইফলাইন’ হিসেবে পরিচিত অভ্যন্তরীণ নৌপথ এখন এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। গত কয়েকদিন ধরে নদীপথের যে চিত্র আমাদের সামনে ভেসে উঠছে, তা কেবল একটি জ্বালানি সংকট নয়, বরং আমাদের সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেইনের এক চরম ভঙ্গুরতার বহিঃপ্রকাশ। ডিজেলের তীব্র হাহাকারে দেশের অন্যতম প্রধান পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা আজ প্রায় স্থবির। যেখানে প্রতিদিন ১০ লাখ লিটার ডিজেলের চাহিদা রয়েছে, সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন কোম্পানিগুলো জোগান দিতে পারছে মাত্র দুই থেকে তিন লাখ লিটার। এই পাহাড়সমান ঘাটতি নিয়ে কোনো সচল নৌপথ কল্পনা করা তো দূরের কথা, এটি এখন দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য এক বিশাল ‘টাইম বোম্ব’ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জ্বালানি তেলের ওপর আমাদের অতি-নির্ভরশীলতা এবং আমদানির ক্ষেত্রে একক বা সীমিত উৎসের ওপর ভরসা রাখা যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি আমাদের তা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই যদি গত বছরের তুলনায় ৮৫ হাজার টন ডিজেল কম আমদানি হয়, তবে সেই বিশাল শূন্যস্থান পূরণে আমাদের বিকল্প ব্যবস্থা কেন আগেভাগে নেওয়া হলো না—আজ এই প্রশ্ন তোলা সময়ের দাবি। চাহিদার মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ তেল দিয়ে একটি দেশের নৌপথ সচল রাখার চেষ্টা করা মানে হলো কার্যত অর্থনীতির চাকা থামিয়ে দেওয়া। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে লাইটারেজ জাহাজ চলাচলে, যার ফলে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে পণ্য খালাস হয়ে সারা দেশে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াটি এক গোলকধাঁধায় আটকে গেছে।
নৌপথ স্থবির হওয়ার এই বহুমুখী প্রভাব আমাদের জাতীয় প্রবৃদ্ধিকে পঙ্গু করে দিতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেলগুলো দিনের পর দিন অলস বসে থাকছে, কারণ ছোট জাহাজ বা লাইটারেজগুলো তেল সংকটে পণ্য নিতে পারছে না। এই বিলম্বের ফলে শিপিং কোম্পানিগুলো কন্টেইনার প্রতি ডেমারেজ চার্জ ৯৫ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ ডলারে নিয়ে গেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার দোহাই দিয়ে ব্যবসায়ীদের ওপর এই যে বাড়তি খরচের বোঝা চাপানো হচ্ছে, তার চূড়ান্ত প্রভাব গিয়ে পড়বে এ দেশের সাধারণ ভোক্তার পকেটে। যখন চাল, ডাল, চিনি বা ভোজ্যতেলের মতো নিত্যপণ্যের দাম এমনিতেই আকাশচুম্বী, তখন এই পরিবহন ও ডেমারেজ খরচ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, বছরে জ্বালানি তেলের মোট চাহিদার প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টনের মধ্যে ৬৩ শতাংশই পূরণ হয় ডিজেল দিয়ে। এর বড় একটি অংশ ব্যবহৃত হয় কৃষি, সেচ, শিল্পকারখানা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিজেলের চাহিদা যেখানে ৪৩ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে বছরের শুরুতেই সরবরাহ ব্যবস্থায় এই ধস নামাটা বড় ধরনের অশনিসংকেত। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং লোহিত সাগরের অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেলের জাহাজ আসতে বিলম্ব হওয়া আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে হতে পারে, কিন্তু সেই পরিস্থিতির জন্য আমাদের অভ্যন্তরীণ ‘জ্বালানি নিরাপত্তা বলয়’ বা স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ কেন আরও শক্তিশালী নয়? বিশেষ করে সৌদি আরব থেকে আসা এক লাখ টন অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়া আমাদের নড়বড়ে মজুত ব্যবস্থাকেই প্রকাশ করে দিয়েছে।
এখানে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা দরকার—তা হলো তথ্যের সমন্বয়হীনতা। চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, আমদানির চিত্র যদি সংকটের কথা না বলে, তবে মাঠপর্যায়ে বা তেলের ডিপোগুলোতে এই তীব্র হাহাকার কেন? ডিলাররা কেন চাহিদার চার ভাগের এক ভাগ তেলও পাচ্ছেন না? এটি কি তবে কোনো ‘কৃত্রিম সংকট’, না কি কোনো প্রভাবশালী মহলের কারসাজি? সরবরাহ শৃঙ্খলের কোথায় ছিদ্র রয়েছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি। সরকারি সংস্থা বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন) আগামী তিন মাসে ১৪ লাখ টন আমদানির লক্ষ্যমাত্রা হাতে নিলেও ডলার সংকটের কারণে এলসি বা ঋণপত্র খুলতে ব্যাংকগুলোর গড়িমসি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সরকার অবশ্য জরুরি পরিস্থিতি সামাল দিতে সুপারস্টার ইন্টারন্যাশনাল (গ্রুপ) লিমিটেডের কাছ থেকে দুই লাখ টন উন্নত মানের ডিজেল আমদানির নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এটি কি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান? বেসরকারি খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাড়িয়ে কতদিন একটি সংবেদনশীল বাজার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের উচিত ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত বিপিসিকে আরও শক্তিশালী করা এবং জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের সংস্থান অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা। শিল্পকারখানাগুলো যখন জ্বালানি সংকটে ধুঁকছে এবং ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে, তখন আমাদের শিল্পোৎপাদন ব্যাপক হারে ব্যাহত হতে পারে।
এই সংকটের সমাধান কেবল নীতিগত অনুমোদন বা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। নদীপথ সচল রাখা মানেই হলো বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। লাইটারেজ জাহাজগুলো যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে সড়ক পথে পরিবহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়বে, যা খরচ ও যানজট—উভয়ই কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে। বর্তমানে কৃষি ও সেচ মৌসুমে ডিজেলের এই অপ্রতুলতা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি হতে পারে। সরকার যদি দ্রুত জ্বালানি তেলের মজুত বৃদ্ধি এবং সরবরাহ তদারকি জোরালো না করে, তবে পণ্য পরিবহনের এই স্থবিরতা দেশের বাজার ব্যবস্থাকে চরম বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেবে।
পরিশেষে, বর্তমান জ্বালানি সংকট আমাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা। জ্বালানি নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এখন থেকেই মজুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আমদানির উৎস বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ দিতে হবে। লোহিত সাগরের দোহাই দিয়ে বছরের পর বছর পার করা যাবে না। আমাদের নিজস্ব মজুত থাকতে হবে অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের। আমদানির আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করে ডলারের প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনীতির এই স্থবিরতা কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে। সাগরের মাঝপথে আটকে থাকা জাহাজের মতো আমাদের জাতীয় অর্থনীতি যেন অনিশ্চয়তার চোরাবালিতে তলিয়ে না যায়, সেজন্য এখনই তড়িৎ ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। নৌপথ সচল রাখা কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থ নয়, এটি দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনের স্পন্দন টিকিয়ে রাখার লড়াই।

