নিজ নিজ সংসদীয় আসনের গ্রামীণ অবকাঠামো ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে সংসদ সদস্যদের জন্য থোক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ বিভাগের ২৪টি সংসদীয় আসনের প্রতিটির জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ অর্থ দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, স্থানীয় হাটবাজার, খেয়াঘাট নির্মাণ-সংস্কার এবং বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ বাস্তবায়ন করা হবে।
পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী, ‘গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (ময়মনসিংহ বিভাগ)’ বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪৯৯ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ৫৬৯ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ১৭৯ কিলোমিটার সড়ক পুনর্বাসন, ৮৬৭ মিটার ব্রিজ নির্মাণ এবং ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪২০টি গাছ রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি, শিল্প ও পর্যটনসমৃদ্ধ এ অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ঢাকার সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ করাই প্রকল্পটির প্রধান লক্ষ্য।
সংসদ সদস্যদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫-০৬ অর্থবছরে তৎকালীন বিএনপি সরকার প্রথম এ ধরনের থোক বরাদ্দ চালু করে। সে সময় প্রতি সংসদীয় আসনের জন্য বরাদ্দ ছিল ২ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তা ধাপে ধাপে বেড়ে দ্বাদশ জাতীয় সংসদের সময় ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সরকারের পতনের কারণে সেই প্রকল্প আর অনুমোদন পায়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নতুন সরকার পুনরায় এ প্রকল্পের উদ্যোগ নেয়। এলজিইডির পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য বিভাগেও একই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।
এলজিইডির সহকারী প্রধান প্রকৌশলী (নির্বাহী প্রকৌশলী) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, সংসদ সদস্যরা উন্নয়নকাজের প্রস্তাব দেবেন এবং এলজিইডি তা বাস্তবায়ন করবে। এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প যাচাই কমিটি (পিইসি) প্রকল্পের ব্যয় ও সমীক্ষা পুনর্মূল্যায়নের পাশাপাশি সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাইরে প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে নতুন এই উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিকল্পনা কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আগের প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম ও প্রকল্প ভাগাভাগির অভিযোগ ছিল। এবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ময়মনসিংহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আবু ওয়াহাব আকন্দ ওয়াহিদ বলেন, গ্রামীণ উন্নয়নে এ উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও অনেক ক্ষেত্রে ৫০ কোটি টাকাও যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে শেরপুর-১ আসনের বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম বরাদ্দ বণ্টনে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দের দাবি জানান।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ২০২০ সালের এক পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, গুরুত্বপূর্ণ পল্লী অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডার ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রায় ১৩ শতাংশ কমিশন বাণিজ্য হয়েছে। পাশাপাশি স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব এবং ৩৩ শতাংশ প্রকল্পে নিম্নমানের কাজের প্রমাণ পাওয়া যায়। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ছাড়া একই ধরনের প্রকল্প চালু করলে ভিন্ন ফল পাওয়ার সম্ভাবনা কম।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সমন্বিত পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং প্রতিটি ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা না গেলে এ ধরনের প্রকল্পেও দুর্নীতির ঝুঁকি থেকে যাবে। একই ধরনের মত দিয়েছেন সাবেক পরিকল্পনা সচিব মো. মামুন আল রশিদ। তিনি বলেন, এমপিদের একচ্ছত্র প্রভাব কমিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে অভিন্ন মানদণ্ড ও কঠোর তদারকির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

