কয়েক বছর আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence বা AI) ছিল মূলত গবেষণা ও পরীক্ষাগারের সীমাবদ্ধ একটি প্রযুক্তি। আজ ChatGPT, Gemini, Copilot, Claude, Canva ও Midjourney-এর মতো AI-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম আমাদের শিক্ষা, গবেষণা, ব্যবসা এবং পেশাজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফলে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগছে-AI যখন ক্রমাগত আরও দক্ষ হয়ে উঠছে এবং মানুষের বহু কাজ সহজ করে দিচ্ছে, তখন কি কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE)-এর গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ আগের মতো থাকবে?
প্রশ্নটি নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, তবে এর উত্তর আরও বেশি আশাব্যঞ্জক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আবির্ভাব CSE-এর ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করেনি; বরং এর গুরুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। AI কম্পিউটার বিজ্ঞানকে প্রতিস্থাপন করছে না, বরং এর পরিধি, প্রয়োগ এবং গুরুত্বকে এমন সব ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত করছে, যা কয়েক বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল। আজ কম্পিউটার বিজ্ঞান আর শুধু সফটওয়্যার তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা, শিল্প উৎপাদন, আর্থিক সেবা, গবেষণা এবং স্মার্ট প্রযুক্তিনির্ভর সমাজ গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ফলে CSE আজ কেবল একটি একাডেমিক ডিসিপ্লিন নয়, বরং ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
প্রযুক্তির ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব কাজের ধরন পরিবর্তন করলেও দক্ষ মানুষের প্রয়োজনীয়তা কখনো কমায়নি। শিল্পবিপ্লব যেমন নতুন পেশা ও সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, AI-ও তেমনি নতুন প্রযুক্তির ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব কাজের ধরন পরিবর্তন করলেও দক্ষ মানুষের প্রয়োজনীয়তা কখনো কমায়নি। শিল্পবিপ্লব যেমন নতুন পেশা ও সম্ভাবনার জন্ম দিয়েছিল, AI-ও তেমনি নতুন কর্মক্ষেত্র ও দক্ষতার চাহিদা তৈরি করছে। AI মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের সক্ষমতাকে আরও বিস্তৃত করার একটি শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি। তাই আজকের CSE গ্র্যাজুয়েটদের শুধু প্রোগ্রামিং জানলেই হবে না; তাদের সমস্যা বিশ্লেষণ, ডেটা ব্যবস্থাপনা, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড প্রযুক্তি এবং AI-নির্ভর সমাধান উদ্ভাবনের সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে ডেটাকে প্রায়ই “নতুন জ্বালানি” বলা হয়। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্মার্ট নগর ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হচ্ছে। এই তথ্যভিত্তিক বিশ্বে Data Science, Machine Learning, AI এবং Data Analytics আগামী দিনের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা ও শ্রমবাজার বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আগামী দশকে AI Specialist, Data Scientist, Cyber Security Analyst, Cloud Engineer, Robotics Engineer এবং Software Developer-এর মতো পেশার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। অর্থাৎ প্রযুক্তির অগ্রগতি কিছু প্রচলিত কাজের ধরন পরিবর্তন করলেও, একই সঙ্গে আরও উন্নত দক্ষতাসম্পন্ন নতুন কর্মক্ষেত্রেরও সৃষ্টি করবে।
এই বাস্তবতায় শুধুমাত্র প্রচলিত প্রোগ্রামিং জ্ঞান আর যথেষ্ট নয়। একজন আধুনিক CSE শিক্ষার্থীর জন্য AI, Machine Learning, Deep Learning, Natural Language Processing, Computer Vision, Data Analytics, Cloud Computing, Internet of Things (IoT), Blockchain এবং Cyber Security সম্পর্কে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন অপরিহার্য। পাশাপাশি যোগাযোগ দক্ষতা, ক্রিটিক্যাল থিংকিং, সৃজনশীলতা, নেতৃত্বগুণ এবং দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকেও তাদের কারিকুলাম, শিক্ষণ পদ্ধতি এবং গবেষণার অগ্রাধিকার পুনর্বিবেচনা করতে হবে। কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা, উদ্ভাবন ও গবেষণাকে শিক্ষার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে। আধুনিক CSE কারিকুলামে AI, Machine Learning, Data Science, Big Data Analytics, Cloud Computing, Cyber Security, Blockchain Technology, Robotics, IoT এবং Generative AI-ভিত্তিক বিষয়সমূহকে আরও গুরুত্বের সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। পাশাপাশি Project-Based Learning, Industry Internship, Hackathon, Capstone Project এবং গবেষণামুখী কার্যক্রমকে শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করতে হবে।
এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE) বিভাগ শিক্ষা, গবেষণা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। মানসম্মত প্রযুক্তি শিক্ষা, আধুনিক ল্যাব সুবিধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার পরিবেশের মাধ্যমে বিভাগটি দেশের স্বনামধন্য CSE বিভাগগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে নিজস্ব অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী নতুন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও শিক্ষাসহায়ক সুবিধা সংযোজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বাস্তবমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।
সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির CSE বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি, টেলিযোগাযোগ খাত, ব্যাংকিং ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসহ নানা শিল্পক্ষেত্রে সুনাম ও দক্ষতার সঙ্গে কর্মরত রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া এবং এশিয়ার বিভিন্ন খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ লাভকরছেন। তাদের এই সাফল্য বিভাগের শিক্ষা, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের একটি ইতিবাচক প্রতিফলন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি AI, Data Science, Machine Learning, IoT, Cloud Computing, Cyber Security এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়সমূহকে আরও শক্তিশালীভাবে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি গবেষণা, উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। আমাদের লক্ষ্য কেবল চাকরিপ্রার্থী তৈরি করা নয়; বরং এমন প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, উদ্ভাবক এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা, যারা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম হবে।
সুতরাং, AI-এর কারণে CSE-এর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত-এ ধারণার বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং AI কম্পিউটার বিজ্ঞানের গুরুত্ব, প্রাসঙ্গিকতা এবং সম্ভাবনাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। আগামী দিনের পৃথিবীতে সফল হবে তারাই, যারা AI-কে ভয় না পেয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়ে বাস্তব সমস্যার কার্যকর সমাধান দিতে পারবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তর, স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গঠনের পথে দক্ষ CSE গ্র্যাজুয়েটদের ভূমিকা হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই লক্ষ্যেই সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি ভবিষ্যতের প্রযুক্তি নেতৃত্ব তৈরিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। AI-এর যুগে CSE-এর ভবিষ্যৎ শেষ নয়; বরং এটাই CSE-এর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সময়।
লেখক :
প্রফেসর বুলবুল আহমেদ
ভারপ্রাপ্ত প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও বিভাগীয় প্রধান
কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (CSE)
সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটি

