আখেরি চাহার সোম্বা মুসলিম সমাজের একটি নীরব অথচ গভীর অনুষঙ্গ। এটি কোনো জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব নয়, কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদতও নয়। বরং এটি এক ধরনের স্মৃতি—যে স্মৃতি নবীজির জীবনের শেষ পর্বের একটি ক্ষণস্থায়ী সুস্থতার মুহূর্তকে ধারণ করে এবং সেই মুহূর্তকে শুকরিয়ার প্রতীক করে তোলে। হিজরি সনের সফর মাসের শেষ বুধবারকে এ নামে ডাকা হয়। আরবি ‘আখেরি’ অর্থ শেষ, ফার্সি ‘চাহার সোম্বা’ অর্থ বুধবার। এই দুই ভাষার মিলনে গঠিত শব্দটি উপমহাদেশের মুসলিম চেতনায় শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে আছে।
এর শুরু নবীজির জীবনের সেই নাজুক সময়ে। ১১ হিজরির সফর মাসে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা ক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তিনি নামাজের ইমামতি করতে পারছিলেন না। সাহাবিরা উদ্বিগ্ন। নবী পরিবার চিন্তিত। সেই কষ্টের মধ্যে সফর মাসের শেষ বুধবার তিনি কিছুটা সুস্থবোধ করেন। গোসল করেন। মসজিদে নববিতে গিয়ে শেষবারের মতো নামাজে ইমামতি করেন। উপস্থিত সাহাবিরা আনন্দিত হন। অনেকে দান-খয়রাত করেন। যদিও পরবর্তীতে তাঁর অবস্থার অবনতি ঘটে এবং রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে তিনি ইন্তেকাল করেন, তবুও সেই সাময়িক সুস্থতার মুহূর্তটি মুসলিম উম্মাহর স্মৃতিতে গভীরভাবে রয়ে যায়। এ দিনটিকে তাই শুকরিয়ার দিন হিসেবে স্মরণ করা হয়।
এ স্মরণ শুধু ঐতিহাসিক নয়, আত্মিকও। মুসলিম সমাজ এ দিনকে অসুস্থতা থেকে মুক্তির প্রতীক, আল্লাহর রহমতের নিদর্শন এবং কৃতজ্ঞতার প্রকাশ হিসেবে গ্রহণ করেছে। যারা এ দিন পালন করেন, তাঁরা সাধারণত গোসল করে দুই রাকাত শুকরানা নফল নামাজ আদায় করেন। রোগমুক্তি, পরিবারের কল্যাণ ও সমাজের মঙ্গল কামনা করে দোয়া করেন। দান-সদকা করেন। মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকায় ওয়াজ, জিকির ও মোনাজাতের আয়োজন হয়। এসব আমল কোনো নির্দিষ্ট শরিয়তি বিধান নয়। বরং এটি একটি ঐতিহ্য—যে ঐতিহ্য নবীজির স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে এবং মানুষকে কৃতজ্ঞতার পথে পরিচালিত করে।
উপমহাদেশে এ দিনটির সাংস্কৃতিক বিস্তার মুঘল আমল থেকেই লক্ষ্য করা যায়। দিল্লির দরবারে এ উপলক্ষে বিশেষ আয়োজন হতো। বাদশাহ ও অভিজাতরা শুকরিয়া প্রকাশ করতেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এ ঐতিহ্য সাধারণ মানুষের জীবনেও ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশেও বহু প্রজন্ম ধরে এ দিনটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবে টিকে আছে। গ্রামীণ সমাজে মসজিদকে কেন্দ্র করে ছোটখাটো আয়োজন হয়। শহরাঞ্চলেও বিভিন্ন সংগঠন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এ দিনকে গুরুত্ব দিয়ে পালন করে। এভাবে আখেরি চাহার সোম্বা ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিক ঐতিহ্যের সেতুবন্ধন তৈরি করেছে।
এ দিনের গুরুত্ব আরও গভীর হয় যখন আমরা সফর মাসের প্রচলিত ধারণার কথা ভাবি। অনেকে সফর মাসকে অশুভ বলে মনে করতেন। কিন্তু নবীজি এ ধারণা খণ্ডন করেছেন। তিনি বলেছেন, কোনো মাস নিজে থেকে অশুভ নয়। আখেরি চাহার সোম্বা সেই প্রেক্ষাপটে একটি ইতিবাচক স্মৃতি বহন করে। অসুস্থতার মধ্যেও আল্লাহর রহমতের নিদর্শন দেখার শিক্ষা দেয় এ দিন। এটি মানুষকে ধৈর্য, আশা এবং শুকরিয়ার পথে পরিচালিত করে। জীবনের কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও কৃতজ্ঞ থাকা—এ শিক্ষাই আখেরি চাহার সোম্বার মূল বার্তা।
তবে এ দিনটিকে নিয়ে মতপার্থক্যও রয়েছে। কিছু আলেম বলেন, নির্ভরযোগ্য হাদিসগ্রন্থে এ দিনের বিশেষ ফজিলত বা নির্দিষ্ট আমলের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। তাঁদের মতে, নবীজির অসুস্থতা ও সুস্থতার ঘটনা ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলেও এ দিনকে বিশেষ উৎসব বা নির্দিষ্ট আমলের দিন হিসেবে পালন করা শরিয়তের বাধ্যবাধকতা নয়। অন্যদিকে, যারা এ দিন পালন করেন, তাঁরা বলেন, এটি শুকরিয়ার প্রকাশ এবং ঐতিহ্যের অংশ। বাংলাদেশে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে এ দিনটি বহুদিন ধরে প্রচলিত থাকায় এটি মুসলিম সমাজের জীবনচক্রের অংশ হয়ে উঠেছে।
এ মতপার্থক্য সত্ত্বেও আখেরি চাহার সোম্বা মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবেই টিকে আছে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি। এ স্মৃতি নবীজির জীবনের শেষ পর্বের সেই ক্ষণস্থায়ী সুস্থতার মুহূর্তকে ধারণ করে এবং সেই মুহূর্তকে শুকরিয়ার প্রতীক করে তোলে। যারা এ দিন পালন করেন, তাঁরা নবীজির স্মৃতি ও আল্লাহর নিয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এ পালন ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতির সমন্বয়।
আজকের সময়ে এ দিনের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়েছে। আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, রোগ-ব্যাধি, মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ কৃতজ্ঞতা হারিয়ে ফেলছে। আখেরি চাহার সোম্বা সেই হারানো কৃতজ্ঞতাকে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি করে। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর নিয়ামত। অসুস্থতার মধ্যেও সুস্থতার আশা রাখা যায়। কষ্টের মধ্যেও শুকরিয়া আদায় করা যায়। এ শিক্ষা ব্যক্তিগত জীবনকেই শুধু নয়, সামাজিক জীবনকেও সমৃদ্ধ করে।
মুসলিম সমাজে এ দিনটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সংহতি। পরিবারের সদস্যরা একত্রিত হন। আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেন। দরিদ্রদের সাহায্য করেন। এভাবে ব্যক্তিগত ইবাদত সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে মিশে যায়। গ্রাম ও শহরের পার্থক্য ঘুচে যায়। ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একসঙ্গে কাজ করে। এ মিশ্রণই আখেরি চাহার সোম্বাকে মুসলিম সমাজের একটি স্থায়ী অনুষঙ্গ করে তুলেছে।
এ দিনের পালন কোনো আড়ম্বরপূর্ণ উৎসব নয়। এটি নীরব, গাম্ভীর্যপূর্ণ এবং অন্তর্মুখী। গোসল, নামাজ, দোয়া ও দান—এসব আমল মানুষকে আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে। এ পথে হাঁটতে গিয়ে মানুষ নবীজির জীবনের সেই শেষ পর্বের কথা স্মরণ করে। স্মরণ করে সেই সাময়িক সুস্থতার মুহূর্তকে। স্মরণ করে সাহাবিদের আনন্দ ও কৃতজ্ঞতাকে। এ স্মরণই আখেরি চাহার সোম্বার প্রকৃত তাৎপর্য।
মুসলিম সমাজের ইতিহাসে এমন অনেক দিন রয়েছে যেগুলো কোনো বাধ্যতামূলক ইবাদত নয়, তবুও সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্ব বহন করে। আখেরি চাহার সোম্বা সেই ধারারই অংশ। এটি নবীজির স্মৃতিকে জীবন্ত রাখে। কৃতজ্ঞতার শিক্ষা দেয়। ধৈর্য ও আশার পথ দেখায়। জীবনের কষ্ট ও অনিশ্চয়তার মধ্যেও আল্লাহর রহমতের প্রতি বিশ্বাস রাখার কথা মনে করিয়ে দেয়।
আজকের দিনে যখন মানুষ ব্যস্ততায়, প্রতিযোগিতায় ও ভোগবাদিতায় ডুবে যাচ্ছে, তখন এ ধরনের নীরব স্মরণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। আখেরি চাহার সোম্বা সেই প্রয়োজন মেটায়। এটি কোনো বড় উৎসবের মতো নয়। এটি একটি ছোট্ট মুহূর্ত—যে মুহূর্তে মানুষ থেমে দাঁড়ায়, নবীজির স্মৃতি স্মরণ করে এবং আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করে। এ থেমে দাঁড়ানোই আখেরি চাহার সোম্বার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
মুসলিম সমাজ যদি এ দিনটিকে শুধু ঐতিহ্য হিসেবে নয়, বরং আত্মশুদ্ধি ও কৃতজ্ঞতার অনুশীলন হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে এর তাৎপর্য আরও গভীর হবে। নবীজির জীবনের সেই শেষ পর্বের সাময়িক সুস্থতার মুহূর্তকে স্মরণ করে আমরা যদি নিজেদের জীবনেও কৃতজ্ঞতা ও ধৈর্যের চর্চা করি, তাহলে আখেরি চাহার সোম্বা শুধু একটি তারিখ থাকবে না—হয়ে উঠবে জীবনযাপনের একটি দর্শন।
এ দিনটি মুসলিম সমাজের আত্মপরিচয়ের অংশ। এটি ইতিহাস, ঈমান ও ঐতিহ্যের মিলনবিন্দু। এটি শুকরিয়ার স্মৃতি। এটি ধৈর্যের শিক্ষা। এটি আশার প্রতীক। আখেরি চাহার সোম্বা তাই মুসলিম সমাজের ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবেই টিকে থাকবে—নীরবে, গাম্ভীর্যের সঙ্গে, এবং গভীর অর্থ নিয়ে।
লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

