বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য ব্যবস্থার রূপান্তরে যাঁরা নীরবে কিন্তু গভীর প্রভাব রেখে চলেছেন, মোঃ মজিবুল হক তাঁদের অন্যতম। তিনি কেবল একজন দক্ষ কৃষিবিজ্ঞানী নন, বরং একজন দূরদর্শী নীতি-ভাবুক, সাপ্লাই চেইন বিশেষজ্ঞ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি অনুশীলনের পথপ্রদর্শক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের এক নিবেদিত কর্মী। বর্তমানে তিনি সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া-এর প্রোগ্রাম লিড এবং সাপ্লাই চেইন ও প্রাইভেট সেক্টর এনগেজমেন্ট বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দুই দশকেরও বেশি সময়ের কর্মজীবনে তিনি বাংলাদেশের কৃষি ভ্যালু চেইন, বাজার ব্যবস্থা ও জলবায়ু অভিযোজনমূলক উন্নয়নে একটি শক্ত ভিত্তি নির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রেখে চলেছেন বিশেষত কৃষি নীতি প্রণয়ন, লক্ষ লক্ষ কৃষকের ক্ষমতায়ন এবং জলবায়ু সহনশীল-স্মার্ট কৃষি পদ্ধতির প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
প্রারম্ভিক জীবন ও দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ: গ্রামবাংলার কৃষি বাস্তবতা, কৃষকের সংগ্রাম এবং বাজারের বৈষম্য খুব কাছ থেকে দেখেই মজিবুল হকের চিন্তাজগৎ গড়ে ওঠে। কৃষি তাঁর কাছে কেবল উৎপাদনের বিষয় ছিল না; বরং এটি ছিল জীবিকা, মর্যাদা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের একটি সমন্বিত ক্ষেত্র। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে প্রচলিত কৃষি উন্নয়ন চিন্তার বাইরে গিয়ে বাজার-নির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জলবায়ু-সহনশীল মডেল তৈরিতে অনুপ্রাণিত করেছে।
শিক্ষা ও পেশাগত প্রস্তুতি: মজিবুল হক শেরে-বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিজ্ঞানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন, যেখানে তাঁর একাডেমিক ভিত্তি তৈরি হয় ফসল উৎপাদন, মাটি ব্যবস্থাপনা এবং কৃষি সম্প্রসারণ বিষয়ে। পরবর্তীতে তিনি আহসানুল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করে ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অর্থনীতির সঙ্গে কৃষিকে যুক্ত করার সক্ষমতা অর্জন করেন। এই বহুমাত্রিক শিক্ষাগত প্রস্তুতিই তাঁকে কৃষিকে কেবল মাঠ পর্যায়ের অনুশীলন নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ভ্যালু চেইন ও বাজার ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভাবতে সহায়তা করেছে।
কর্মজীবনের সূচনা ও আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা: ২০০৩ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কাজের মাধ্যমে তাঁর পেশাগত যাত্রা শুরু। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কৃষি উন্নয়নে প্রকল্পভিত্তিক কাজের সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করেন এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে কৃষি, জলবায়ু পরিবর্তন, বাজার ব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন, কর্মশালা ও নীতিনির্ধারণী ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। এখন পর্যন্ত তিনি ১০০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন এবং বহু ক্ষেত্রে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। কৃষি নীতি, বাজার ব্যবস্থা এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরি নিয়ে তাঁর লেখা প্রবন্ধ ও বক্তব্য বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয় ।
সাপ্লাই চেইন ও বাজার ব্যবস্থায় উদ্ভাবনী নেতৃত্ব: মজিবুল হকের কাজের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কৃষিকে ‘সাবসিস্টেন্স’ বা জীবনধারণমূলক কাঠামো থেকে বের করে একটি টেকসই ব্যবসায়িক ব্যবস্থায় রূপান্তর করা। তিনি বিশ্বাস করেন, কৃষক তখনই শক্তিশালী হন, যখন তিনি বাজারের অংশীদার হন—শুধু কাঁচামালের সরবরাহকারী নন। এই দর্শনের ভিত্তিতেই তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষি ভ্যালু চেইনে সরাসরি বাজার সংযোগ, ন্যায্য মূল্য নির্ধারণ এবং চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রচলন করেন।
তাঁর নেতৃত্বে প্রণীত ও সরকারের কাছে গৃহীত কন্ট্রাক্ট ফার্মিং মডেল ফল ও সবজি রপ্তানিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে। এই মডেলের মাধ্যমে কৃষক, রপ্তানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশের কৃষি রপ্তানি গত দেড় দশকে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ১.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।
মান নিয়ন্ত্রণ, GAP এবং আম রপ্তানি ব্যবস্থাপনা: বাংলাদেশ GAP (Good agricultural Practices) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মুজিবুল হকের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কৃষি উৎপাদনে নিরাপত্তা, মান এবং ট্রেসেবিলিটি নিশ্চিত করার জন্য কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সার্টিফিকেশন এবং মনিটরিং ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেন। বিশেষ করে আম রপ্তানি খাতে তাঁর নেতৃত্বে একটি সমন্বিত মান নিয়ন্ত্রণ ও রপ্তানি ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠে, যার ফলে আম রপ্তানি ৩০০–৪০০ টন থেকে বেড়ে প্রায় ৩৭০০ টনে উন্নীত হয়। এটি কেবল পরিমাণগত সাফল্য নয়; বরং বাংলাদেশের কৃষি পণ্যের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি মাইলফলক।
জলবায়ু-সহনশীল ও রিজেনেরেটিভ কৃষি: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় মজিবুল হক কৃষিকে অভিযোজন ও প্রশমন—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখেন। তাঁর নেতৃত্বে রিজেনেরেটিভ কৃষি, জলবায়ু-স্মার্ট চাষাবাদ, মাটি স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার, পানি ব্যবস্থাপনা এবং কার্বন হ্রাসমূলক প্রযুক্তির প্রসার ঘটে। বর্তমানে তাঁর সঙ্গে যুক্ত প্রকল্পগুলোর প্রায় ৮৫% কৃষক এই ধরনের চর্চা অনুসরণ করছেন, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশগত স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করছে। ভোজ্যতেলের আমদানি নির্ভরতা কমাতে তিনি উপকূলীয় অঞ্চলে বারি-৪ ও বিইউ-২ সয়াবিনের মতো উন্নত জাতের চাষ প্রসারে কাজ করছেন।
আর্থিক উদ্ভাবন ও কৃষকের সক্ষমতা বৃদ্ধি: কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ঋণ নির্ভরতা কমানো মজিবুল হকের কাজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। সলিডারিডাড -এর ‘পাথওয়ে টু প্রসপারিটি’ প্রোগ্রামের মাধ্যমে তিনি ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য বিকল্প আর্থিক মডেল চালু করেন। ROSCA (Rotating Savings and Credit Association)-এর মতো সঞ্চয়ভিত্তিক ব্যবস্থার মাধ্যমে কৃষকরা উচ্চ সুদের ঋণের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ পান এবং নিজেরাই পুঁজি গঠনে সক্ষম হন।
দুগ্ধ খাত ও গ্রিন ডেইরি পার্টনারশিপ: বর্তমানে তিনি ডেনমার্ক সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ‘গ্রিন ডেইরি পার্টনারশিপ’ প্রকল্পের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যার লক্ষ্য বাংলাদেশে দুগ্ধ খাতে কার্বন নিঃসরণ ৩০% কমিয়ে আনা। এই প্রকল্পে পশু খাদ্য, খামার ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি ব্যবহার এবং বাজার সংযোগ—সবকিছুই একটি সমন্বিত পরিবেশবান্ধব কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে।
নারী ক্ষমতায়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: নারীর ক্ষমতায়ন মজিবুল হকের উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রে অবস্থান করে। তাঁর পরিচালিত প্রকল্পগুলোর প্রায় ৬৫% অংশগ্রহণকারী নারী, যাঁরা কৃষি উদ্যোক্তা, প্রক্রিয়াজাতকারী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। এই নারীরা শুধু নিজেদের পরিবার নয়, বরং স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকেও শক্তিশালী করছেন।
ভবিষ্যৎ ভাবনা/ দূরদর্শী লক্ষ্য: মজিবুল হকের মতে, উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া, কোনো একক প্রকল্প বা অর্জনে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর লক্ষ্য বাংলাদেশের কৃষিকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে কৃষক মর্যাদার সঙ্গে বাঁচবেন, বাজার হবে ন্যায্য ও স্বচ্ছ, এবং কৃষি হবে পরিবেশের সঙ্গে সহাবস্থানমূলক। তাঁর তৈরি মডেল ও নীতিগত অবদান ইতোমধ্যেই সারা দেশে অনুসৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও বাংলাদেশের কৃষি রূপান্তরের পথনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে।

