ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক বিধবার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়ার কয়েক দিন পর একটি কাগজে তাঁর টিপসই নেওয়া হয়। এরপর গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে, ওই নারীর বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁকে একটি কাবিননামাও দেখানো হয়। তবে ওই নারী দাবি করেছেন, তিনি কোনো বিয়েতে সম্মতি দেননি এবং কোনো কাজির উপস্থিতিতেও বিয়ে করেননি।
সম্প্রতি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার একটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দুই দফা সালিস বৈঠকও করেছেন। ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে স্থানীয় জামায়াতের সহযোগী সদস্য হিসেবে পরিচয় দেওয়া আবদুস ছাত্তার কৌশলে তাঁর টিপসই নেন। পরে ওই টিপসই ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে বিয়ের কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে।
প্রায় ১৩ বছর আগে ওই নারীর স্বামী মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর মানুষের জমিতে কাজ করে তিনি দুই ছেলেকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। তাঁর নাতি-নাতনিও রয়েছে। গতকাল বুধবার তাঁর বাড়িতে গিয়ে কথা হলে তিনি বলেন, ‘আমি কোথাও বিয়ে করতে যাইনি। কোনো কাজিকেও দেখিনি।’
ছড়িয়ে পড়া কাবিননামায় বর হিসেবে স্থানীয় আবদুল কুদ্দুসের নাম রয়েছে। ওই নারী জানান, কুদ্দুস বিভিন্ন সময় তাঁকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি কখনো রাজি হননি। কুদ্দুসের সংসারে স্ত্রী, সন্তান ও নাতি-নাতনি রয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
তবে কুদ্দুসের স্ত্রী সুফিয়া খাতুন বলেন, তাঁর স্বামী বিয়ের বিষয়ে তাঁকে আগে কিছু জানাননি। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর কুদ্দুস দাবি করেন, তিনি ওই নারীকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ করেছেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁকে বোঝানোর চেষ্টা করলেও তিনি কারও কথা শোনেননি।
কাবিননামায় দেখা যায়, কাজি গোলাম মোস্তফা বিয়ে সম্পন্ন করেছেন বলে উল্লেখ রয়েছে। এতে দেনমোহর আড়াই লাখ টাকা এবং ৫০ হাজার টাকা নগদ পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। সাক্ষী হিসেবে আবদুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামের নাম রয়েছে। তবে সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি কোনো বিয়ের সাক্ষী হননি।
কাজি গোলাম মোস্তফাও ওই বিয়ে সম্পন্ন করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, ছড়িয়ে পড়া কাগজটি সম্পূর্ণ জাল। তিনি জানান, ২০২০ সালেও তাঁর নাম ব্যবহার করে এমন একটি জাল কাগজ তৈরি করা হয়েছিল। ওই ঘটনায় তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছিলেন। এবার কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়, সে বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করে আবদুস ছাত্তার বলেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে তিনি ওই নারীর কাছ থেকে কোনো টিপসই নেননি। জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে তাঁকে ফাঁসানো হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
উপজেলা জামায়াতের আমির মো. ফজলুল হক বলেন, বিষয়টি জানার পর স্থানীয় দায়িত্বশীলদের মাধ্যমে তাঁরা খোঁজ নিয়েছেন। তাঁর দাবি, আবদুস ছাত্তার জামায়াতের কোনো পদধারী নেতা নন; গত নির্বাচনের সময় তিনি একটি কেন্দ্র কমিটির সহযোগী সদস্য ছিলেন। এর আগে তিনি বিএনপি করতেন। বিষয়টি তাঁরা খতিয়ে দেখছেন। প্রকৃত অপরাধীদের বিচার হওয়া উচিত উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি সাজানো বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতও হতে পারে।
গত সোমবার ও বুধবার গ্রামে দুই দফা সালিস অনুষ্ঠিত হয়। তবে সালিসে আবদুস ছাত্তার ও আবদুল কুদ্দুস কেউই উপস্থিত ছিলেন না। তাঁদের শুক্রবার পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছে। এরপরও আবদুস ছাত্তার তাঁর অবস্থান স্পষ্ট না করলে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান সালিসে নেতৃত্ব দেওয়া মোহাম্মদ রুস্তম আলী। তিনি বলেন, ‘কীভাবে কী হলো, আমরা যাচাই করছি। সালিসের মাধ্যমে সমাধান না হলে আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া হবে।’
ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ রাশেদুল হাসান বলেন, ঘটনাটি তাঁরা বিভিন্নজনের কাছ থেকে শুনেছেন। তবে এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

