গত ২ মে সিলেটে দিনব্যাপী কর্মসূচি নিয়ে ঝটিকা সফর করে গেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটা তার প্রথম সিলেট সফর। সিলেট তার শ্বশুরবাড়িও। স্ত্রী জুবাইদা রহমানকে হাতে ধরে সিলেটের মাটিতে পা রাখা এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ‘দুলাভাই, দুলাভাই’ স্লোগান ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। সবগুলো অনুষ্ঠানেই বক্তব্যে তিনি যে বার্তাটি দিয়ে গেছেন সেটি হচ্ছে— উন্নয়নে সিলেট আর পিছিয়ে থাকবে না। সিলেটের মানুষ তার কথায় আশায় বুক বেঁধেছেন।
সিলেট কারও কাছে ‘পুণ্যভূমি’, কারও কাছে ‘আধ্যাত্মিক রাজধানী’। বড় রাজনৈতিক দলগুলো সবসময়ই সিলেট থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। এবারও বিএনপি করেছে। আরেকটা মিথ আছে, সিলেট-১ আসনে যে দলের প্রার্থী জয়লাভ করেন সেই দলই সরকার গঠন করে। এবারও ব্যতিক্রম হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই এমনটি হয়ে আসছে। যদিও সিলেটবাসীর মনে অনেক ক্ষোভ। সেটি উন্নয়ন বঞ্চনার।
১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে একমাত্র সিলেট সদর আসনটি পায় বিএনপি। এমপি নির্বাচিত হন খন্দকার আব্দুল মালিক। রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর সিলেটে এই দলের কর্তৃত্ব ছিল তার হাতেই। ক্রমেই দলের পরিধি বড় হতে থাকলে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রভাব প্রতিপত্তিও বাড়ে। তার এই ক্রমোন্নতি বেশিদূর এগোতে দেননি দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। খন্দকার মালিক একপর্যায়ে ক্ষোভে, দুঃখে এবং অপমানবোধ নিয়ে সিলেট বিএনপির রাজনীতি থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। তখন বিএনপির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সাইফুর রহমানের হাতে। এ অবস্থাতেই ২০০৭ সালে খন্দকার আব্দুল মালিক মারা যান ।
এবার এই আসনেই সংসদ সদস্য হয়েছেন খন্দকার মালিকের ছেলে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর। মিথ অনুযায়ী সরকারও বিএনপির। বাবার পর ছেলেও এখন সেই মেরুকরণের মুখোমুখি। সংকট বহুমুখী। এ ছাড়া সিলেট নগরে চাঁদাবাজি, স্ট্যান্ড দখল, হানাহানি ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় যেসব নাম আসে তার বেশির ভাগই বিএনপির অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে মন্ত্রী-এমপিরা পুরোপুরি ওয়াকিবহাল নন এটাও বড় সমস্যা। বিএনপিকে সুসংগঠিত করা এখন প্রধান কাজ বলে মনে করেন দলের অনেক নেতাকর্মী। সিলেটের মানুষের কাছে বিএনপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে এখন দরকার দল গোছানো এবং কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন।
সিলেটের মানুষ যে নিজেদের ‘বঞ্চিত’ মনে করেন সেটি প্রধানমন্ত্রী ২ মে অনুভব করে গেছেন। শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর সুধী সমাবেশে বলেছেন, ‘সিলেটের যে কারো হাতে মাইক্রোফোন দিলেই প্রথমেই যে কথাটি উচ্চারিত হয়, তা হলো— সিলেট বৈষম্যের শিকার।’ অবশ্য এই কথা তিনি পুরোপুরি সমর্থন করেন না জানিয়ে বলেছেন, ‘এই আসনের এমপি ছিলেন সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী এম সাইফুর রহমান। বলা হয়ে থাকে, অন্য অঞ্চলের বরাদ্দ কেটে এনে সাইফুর রহমান সিলেটের উন্নয়ন করেছেন। এরপরে সিলেটে দুজন মন্ত্রী ছিলেন। তারা কি করেছেন? তাই বৈষম্যের শিকার নাকি ওই মন্ত্রীদের পারফরম্যান্সের সমস্যা তা ভাবা দরকার।’
তবে সিলেটের মানুষের মনোভাব প্রধানমন্ত্রী বুঝেছেন এটা সাধারণ মানুষ মনে করেন। নির্বাচনী প্রচারে সিলেট এসেও সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের দুর্ভোগ নিয়ে কথা বলেছিলেন। এবার সেই মহাসড়কের দুর্ভোগ লাঘবের আশ্বাস দিয়েছেন। সিলেট-ঢাকা রেলপথে ডাবল লাইন চালু, জলাবদ্ধতা ও বন্যার হাত থেকে নগরবাসীকে রক্ষায় প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন, আইটি পার্ক চালু, ওসমানী হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা বাড়ানো, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল দ্রুত চালুসহ অনেকগুলো মৌলিক সমস্যা সমাধানের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী।
এখন বড় পরীক্ষা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের। তারা স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধানে কতটুকু কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন তার ওপর নির্ভর করছে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন। সিলেট বিভাগের ১৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতেই এখন বিএনপির সংসদ সদস্য রয়েছেন। সরকারে দুজন মন্ত্রী রয়েছেন। আছেন একজন হুইপ। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পদেও আছেন একজন। এ অবস্থায় সিলেটবাসীর প্রত্যাশা অনেক।
প্রধানমন্ত্রী সিলেটের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে ফসলহানির কথা উল্লেখ করে কৃষকদের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। নগরের জলাবদ্ধতার কথা বলেছেন। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাশমির রেজা আগামীর সময়কে জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী যেসব বিষয়ে উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছেন সেগুলো কাঙ্ক্ষিত ছিল। সিলেটের সামগ্রিক উন্নয়নে তার এই ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। এটা তার আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ। এখন আমরা এসবের বাস্তবায়ন চাই।’
নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে স্লুইস গেট নির্মাণের ব্যাপারে সঠিক বাস্তবায়ন দরকার মন্তব্য করে তিনি জানান, তা না হলে পরিবেশগত ক্ষতি বাড়বে। প্রধানমন্ত্রী হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেবেন এটাও প্রত্যাশা করেন কাশমির রেজা।
প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরের আগে সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে ২৫ দফা দাবি জানিয়েছিল সিলেট বিভাগ গণদাবি ফোরাম। সংগঠনের সভাপতি চৌধুরী আতাউর রহমান আজাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘প্রধানমন্ত্রী উন্নয়নের যে আশ্বাস দিয়েছেন এগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন চাই। পাহাড়ি ঢল এবং অতিবৃষ্টির কারণে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী প্রস্তাব অনুযায়ী নগরের ভেতর দিয়ে খাল খনন করার দাবি জানান তিনি। তাদের সংগঠনের ২৫ দফা দাবির অনেকগুলোর ব্যাপারে কোনো ঘোষণা না আসায় হতাশা ব্যক্ত করে তিনি জানান, ‘আমরা সিলেটবাসী চিরকাল অবহেলিত, বঞ্চিত। প্রধানমন্ত্রী দুলাভাই, জাতীয় সংসদের স্পিকার দুলাভাই এমনকি বিরোধীদলীয় নেতাও ভাই। তাই এই সরকারের আমলে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন চাই।’
প্রধানমন্ত্রী সিলেটবাসীর মন জয় করে যেতে পারলেও তার দল মানুষের মন জয় কতটুকু করতে পারবে এ নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। স্থানীয় বিএনপির কমিটি নিয়ে কোন্দল আছে। নানা কারণে নির্বাচিত সভাপতি দায়িত্বে নেই। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি দিয়ে চলছে মহানগর বিএনপি। ভারপ্রাপ্ত সভাপতি যেমন সক্রিয় তেমনি ‘নির্বাচিত সভাপতি মহানগর বিএনপি’এমন ব্যানার-ফেস্টুনও নগরজুড়ে দেখা যায়। বিএনপি তার অতীতের ধারায় নেই এমনটিও অনেকের ধারণা। সিলেটে সবসময়ই বিএনপিতে দুটি ধারা লক্ষ করা গেছে। বর্তমানেও সেটি সক্রিয় রয়েছে। মূল সংগঠনের এই বিভক্তি যুবদল, ছাত্রদলসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনেও বিদ্যমান।
সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি এবং সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সিলেট সফরকে ‘সিলেটের উন্নয়নে নতুন আশার বার্তা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘দীর্ঘদিন উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে থাকা সিলেট এখন নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে।’

